চলতি বছরের শেষ নাগাদ দেশে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মূল ভিত্তি হলো সক্রিয় স্থানীয় সরকারব্যবস্থা। রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামো কতটা সুসংহত, তা পরিমাপের অন্যতম মানদণ্ড হলো এর স্থানীয় সরকারব্যবস্থার কার্যকারিতা। আমরা মনে করি, সরকারের পক্ষ থেকে চলতি বছরের শেষ নাগাদ দেশজুড়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের যে ঘোষণা এসেছে, তা শুধু একটি আইনি বাধ্যবাধকতাই নয়, বরং এটি দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। দীর্ঘদিন পর গ্রাম থেকে শহর সর্বত্র ভোটের হাওয়া বইতে শুরু করেছে।
গণতন্ত্রের প্রকৃত সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে এবং রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থায় গতিশীলতা আনতে এই নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। দেখা যাচ্ছে, এরই মধ্যে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি, বিরোধীদলীয় জোট জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মতো রাজনৈতিক দলগুলোর স্থানীয় নেতাদের মধ্যে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্রাম-গঞ্জে জনগণের মধ্যেও আলোচনায় এখন আসন্ন নির্বাচন; যা প্রমাণ করে, জনসাধারণ ও রাজনৈতিক কর্মীরা দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর একটি প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের জন্য মুখিয়ে আছেন। বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলোর তৃণমূল পর্যায়ে নেতৃত্বের সংকট দূর করতে এবং জনআকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে এই নির্বাচন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
গণতন্ত্র কেবল ভোট প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি জনগণের কাছে জবাবদিহিতার একটি প্রক্রিয়াও। স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিরা সরাসরি জনসাধারণের সমস্যা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সেবামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। কাজেই শাসনব্যবস্থায় গতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এবং জনমনে আস্থা বৃদ্ধিতে একটি সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অপরিহার্য। যখন তৃণমূলের প্রতিনিধিরা জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন, তখন প্রশাসনের ওপর জনগণের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং নাগরিক সেবার মান বৃদ্ধি পায়। ইতিবাচক লক্ষণ এই যে, বিভিন্ন জেলায় ইতোমধ্যেই প্রার্থীরা তাদের প্রচারণা শুরু করেছেন। চট্টগ্রাম, পাবনা, খুলনা, মাগুরাসহ সারা দেশেই গণসংযোগে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। তবে গণতন্ত্রের স্বার্থে স্মরণে রাখতে হবে, কেবল নির্বাচন অনুষ্ঠানই যথেষ্ট নয়; সেই নির্বাচন হতে হবে অবাধ, নিরপেক্ষ এবং সবার জন্য সমান সুযোগ সংবলিত। সাধারণ ভোটাররা যেন নির্ভয়ে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন, তা নিশ্চিত করা নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব। এছাড়া দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্থানীয় পর্যায় থেকে নতুন নেতৃত্ব উঠে আসাও অত্যন্ত জরুরি।
আমরা মনে করি, দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা স্থানীয় সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য যোগ্য ও জনবান্ধব প্রতিনিধি নির্বাচন করে ভোটাররা সচেতনতার পরিচয় দেবেন। রাজনৈতিক দলগুলোর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা নিশ্চিত হলে এ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো হবে আরও সুসংহত। কারণ তৃণমূলের ক্ষমতায়নই পারে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে চালিকাশক্তি হিসাবে কাজ করতে। ডিসেম্বরের সম্ভাব্য এই নির্বাচন যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতা না হয়ে প্রকৃত অর্থেই গণতন্ত্র চর্চার মহোৎসব হয়ে ওঠে-এটাই প্রত্যাশা।