জুলাই যোদ্ধা ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগী আলমগীর হোসেন অবশেষে ভারত থেকেই গ্রেফতার হয়েছেন। শনিবার রাতে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁও এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করে ভারতীয় পুলিশ। রোববার পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্কফোর্সের (এসটিএফ) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
গ্রেফতারের পর ফয়সাল ও আলমগীরকে রোববার বিধাননগর আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তাদের ১৪ দিনের রিমান্ডে পাঠানোর নির্দেশ দেন। অপরদিকে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্কফোর্সের (এসটিএফ) সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, তাদের কাছে গোপন ও বিশ্বাসযোগ্য তথ্য ছিল-বাংলাদেশে চাঁদাবাজি, হত্যাকাণ্ডসহ গুরুতর অপরাধ করার পর দুই বাংলাদেশি নাগরিক পালিয়ে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেছে। সুযোগ পেলে তারা আবার বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বনগাঁও সীমান্ত এলাকায় আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছিল।
এসটিএফ আরও জানায়, এই তথ্যের ভিত্তিতে শনিবার মধ্যরাতে অভিযান চালিয়ে বনগাঁও এলাকা থেকে দুই বাংলাদেশি নাগরিককে আটক করা হয়। তারা হলেন পটুয়াখালীর রাহুল ওরফে ফয়সাল করিম মাসুদ (৩৭) এবং ঢাকার আলমগীর হোসেন (৩৪)। এতে আরও বলা হয়, দুজনকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে রাহুল ওরফে ফয়সাল করিম মাসুদ সহযোগী আলমগীর হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক কর্মী শরীফ ওসমান হাদিকে হত্যা করেন এবং পালিয়ে যান। তারা মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশ করেন। ভারতের বিভিন্ন স্থানে ঘোরাফেরা করার পর শেষ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁও এলাকায় আসেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল-সুযোগ পেলে আবার বাংলাদেশে ফিরে যাওয়া।
স্পেশাল টাস্কফোর্স জানায়, এ বিষয়ে একটি মামলা করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট আদালতে হাজির করার পর তাদের পুলিশ হেফাজতে পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে আরও তদন্ত চলছে।
উল্লেখ্য, গত বছর ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের কিছুক্ষণ পর রাজধানীর পুরানা পল্টনের কালভার্ট রোডে রিকশায় যাওয়ার পথে ওসমান হাদিকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। খুব কাছ থেকে তাকে মাথায় গুলি করার পর দুর্বৃত্তরা মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যায়। পরে ওসমান হাদিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে ১৮ ডিসেম্বর তিনি মারা যান। ওসমান হাদির মৃত্যুর পর ফুঁসে ওঠে সারা দেশ। হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে দেশব্যাপী তীব্র আন্দোলন শুরু হয়। তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বড় রকমের চাপে পড়ে। হাদি হত্যা মামলার তদন্তে নামে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন আলমত জব্দ করা হয়। গ্রেফতার করা হয় ফয়সালের বাবা, মা, স্ত্রীসহ বেশ কয়েকজনকে।
তবে মূল অভিযুক্ত ফয়সাল অধরাই থেকে যায়। তদন্ত চলাকালে পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, মূল শুটার ফয়সাল ও তার সহযোগী আলমগীর ঘটনার রাতেই ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে গেছে। তবে বাংলাদেশ পুলিশের এ দাবি প্রথম থেকেই নাকচ করে আসছিল ভারতের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
এদিকে এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিআইডি প্রধান মো. ছিবগাত উল্লাহ রোববার সন্ধ্যায় যুগান্তরকে বলেন, ‘ভারতে মূল শুটার ফয়সালসহ দুইজনের গ্রেফতারের তথ্যটি আমরা যাচাই করছি। নিশ্চিত হওয়ার পর আমরা আইনগত প্রক্রিয়ায় তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার কার্যক্রম শুরু করব।’
মূল আসামি গ্রেফতারের পর প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে ইনকিলাব মঞ্চের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক ফাতেমা তাসনিম জুমা যুগান্তরকে বলেন, ‘গ্রেফতার ব্যক্তিদের যত দ্রুতসম্ভব দেশে এনে যে কোনো উপায়ে হত্যাকাণ্ডের পেছনে যারা আছে এবং তারা যত বড় রাঘববোয়াল হোক না কেন, তাদের নাম যেন প্রকাশ করা হয়। দ্রুত সময়ে যেন তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হয়। এর আগে একজন কাউন্সিলরকে মাস্টারমাইন্ড বানিয়ে যেভাবে চার্জশিট দেওয়া হয়েছিল, সেরকম যেন সাজানো না হয়।’
এদিকে রোববার রাতে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) এক বার্তায় জানানো হয়, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দাদের সুস্পষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি ও মূল শুটার ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল অবশেষে ভারতে গ্রেফতার হয়েছেন। সম্প্রতি ডিজিএফআই-এর নবনিযুক্ত মহাপরিচালক ভারত সফর করেন। তিনি ওই সময় ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে হাদি হত্যা মামলার আসামিসহ সব সন্ত্রাসীকে আটক করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য অনুরোধ করেন। সেই প্রেক্ষাপটে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সুস্পষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তাদের আটক করতে সক্ষম হয়। এছাড়া বাংলাদেশের আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতে বসে বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণাকারীদের বিরুদ্ধেও সাঁড়াশি অভিযান চালাবে বলে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ নিশ্চয়তা দিয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, শরিফ ওসমান বিন হাদি নতুন ধারার রাজনীতি শুরু করেছিলেন। সেই রাজনীতির কারণেই ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও মিরপুর এলাকার সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরীর (বাপ্পী) নির্দেশনা ও পরিকল্পনায় শরিফ ওসমান বিন হাদিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে ফয়সাল করিম। ওই সময় সহযোগী হিসাবে মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলেন আলমগীর হোসেন। ফয়সাল করিম ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ও আলমগীর আদাবর থানা যুবলীগের কর্মী। এ হত্যাকাণ্ডের পর ফয়সাল ও আলমগীর ছাড়াও সাবেক কাউন্সিলর তাইজুল ইসলামও ভারতে পালিয়ে যান বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা।
হাদিকে গুলি করার পর ১৪ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বাদী হয়ে পল্টন থানায় একটি হত্যাচেষ্টা মামলা করেন। তবে হাদির মৃত্যুর পর ২০ ডিসেম্বর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মামলায় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা (হত্যা) সংযোজনের আদেশ দেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সিদ্দিক আজাদ। ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগ দ্রুত সময়ে তদন্ত শেষ করে। ৬ জানুয়ারি ১৭ জনের বিরুদ্ধে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক ফয়সাল আহমেদ।
তবে ডিবির দেওয়া চার্জশিটে অসন্তোষ প্রকাশ করে ১৫ জানুয়ারি আদালতে নারাজি আবেদন দাখিল করেন মামলার বাদী। আদালত সেই আবেদন গ্রহণ করে মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেন। এরপর ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য ছিল। তবে তদন্ত সংস্থা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) প্রতিবেদন জমা না দেওয়ায় ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ১১ মার্চ দিন ধার্য করেছেন।
এদিকে হাদি হত্যা মামলায় কারাগারে রয়েছেন প্রধান অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদের বাবা মো. হুমায়ুন কবির, মা মোসা. হাসি বেগম, স্ত্রী সাহেদা পারভীন সামিয়া, বান্ধবী মারিয়া আক্তার লিমা এবং শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ সিপু। মামলার পলাতক আসামিরা হলেন রাজধানীর মিরপুরের সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি, ফিলিপ স্মাল পিলিপস, মুক্তি আক্তার ও ফয়সালের বোন জেসমিন আক্তার।
এদিকে ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাবে ১২৭ কোটি টাকার বেশি অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পায় সিআইডি। ২৩ ডিসেম্বর আদালত ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের আদেশ দেন। সেদিনই ফয়সালের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেন আদালত।
বাংলাদেশ পুলিশের তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হাদি হত্যার মূল ছক কষা হয় পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে বসে। পলাতক আওয়ামী লীগের নেতাদের প্রত্যক্ষ সহায়তায় ঘটে এ হত্যাকাণ্ড। মানব পাচারকারী ফিলিপের মাধ্যমে খুনিদের নিরাপদে সীমান্তের ওপারে নিয়ে যায় ভারতে অবস্থানকারী যুবলীগের নেতা তাইজুল ইসলাম চৌধুরী ওরফে বাপ্পি। তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে গোয়েন্দারা জানতে পারেন, বাপ্পির ভগিনীপতি আমিনুল ইসলামের মাধ্যমে ১২ ডিসেম্বর দুপুরে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্তের মানব পাচারকারী ফিলিপের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে বাপ্পি। আমিনুলের মাধ্যমে পিলিপের কাছে টাকাও পাঠানো হয়। ওইদিন গভীর রাতে ফয়সাল ও আলমগীরকে সীমান্ত পার কারার বিষয়টি বাপ্পিকে নিশ্চিত করে ফিলিপ। পুরো বিষয়টি স্বল্পসময়ে নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়।