অনেকটাই আশ্চর্য হবেন প্রথমে দেখে। পেয়ারার জন্যই আলাদা বাজার, আলাদা এক রাজ্য। যত খুশি কিনে নিতে পারেন কম দামে। নৌকায় ঘুরতে ঘুরতে পেয়ারা কেনা আর খাওয়ার যে অনুভূতি তা থেকে মনে হবে আপনি অন্য কোনো দেশে ভাসছেন। নৌকা ভরতি পেয়ারার রাজ্যে ছবি তোলার যেন জুড়ি নেই। ফ্রেমবন্দী করে নিজের কাছের এমন মনোরম দৃশ্যকে ছড়িয়ে দেয় অনেকেই।
ঝালকাঠি জেলা শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই ভাসমান বাজার। ভাসমান এ বাজারে পেয়ারার মৌসুমে সর্বোচ্চ বেচাকেনা হয়। বাজার চলে সপ্তাহের প্রতিদিন। বাজারের আশপাশে প্রতিটি বাড়িতেই রয়েছে একটি করে ডিঙ্গি নৌকা।
সাতলা শাপলা গ্রাম
শীতের প্রহরে বিল দেখার মতো দারুণ কিছুই যেন নেই। পাখ-পাখালির মেলা যেন বসে বিলে। নানান ফুলে ঘেরা থাকে বিলের প্রান্তর। তেমনই এক বিল বরিশালে। বাংলার চিরায়ত রূপ ধরা দেবে আপনার চোখে সেখানে গেলে।
লাল আর সবুজের মাখামাখি দূর থেকেই চোখে পড়বে। কাছে গেলে ধীরে ধীরে সবুজের পটভূমিতে লালের অস্তিত্ব আরো গাঢ় হয়ে ধরা দেবে। চোখ জুড়িয়ে দেবে জাতীয় ফুল শাপলার বাহারি সৌন্দর্য। আগাছা আর লতাগুল্মে ভরা বিলের পানিতে ফুটে আছে হাজার হাজার লাল শাপলা। সূর্যের সোনালি আভা শাপলাপাতার ফাঁকে ফাঁকে পানিতে প্রতিফলিত হয়ে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে বিলের সৌন্দর্য। নৌকা কিংবা হাঁটুপানি মাড়িয়ে বিলের ভেতর ঢুকলে মনে হবে বাতাসের তালে তালে এপাশ-ওপাশ দুলতে দুলতে হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানাচ্ছে শাপলারা। সে হাসিতে বিলজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে আনন্দধারা।
বরিশাল সদর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে উজিরপুর উপজেলার সাতলা ইউনিয়নের উত্তর সাতলা গ্রাম। বিলের নামও গ্রামের নামেই- সাতলা বিল। তবে শাপলার রাজত্বের কারণে সেটি শাপলা বিল নামেই বেশি পরিচিতি পেয়েছে। এরইমধ্যে বরিশালের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিলের কথা ছড়িয়ে পড়েছে দেশ-বিদেশে। শীতের মৌসুম আপনার জন্য ভ্রমণের সেরা জায়গা হতে পারে এটি।
বিবির পুকুর পাড়
বরিশাল শহরের মধ্যেই পাবেন গ্রামীণ জীবনের ছোঁয়া। নগরীর প্রান্তে যেখানে দেখা মেলে না পানির উৎস সেখানে ব্যতিক্রম বরিশাল। বিবির পুকুর বরিশাল নগরীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত একটি শতবর্ষের পুরানো ও ঐতিহ্যবাহী কৃত্রিম জলাশয়। ১৯০৮ সালে উইলিয়াম কেরির পালিত সন্তান জিন্নাত বিবির উদ্যোগে জনগণের জলকষ্ট নিরসনের জন্য নগরীর সদর রোডের পূর্ব পাশে ৪০০ ফুট দীর্ঘ্য ও ১৮৫০ ফুট প্রশস্থ একটি পুকুর খনন করা হয়। পরবর্তীতে তার নাম অনুসারে এটির নাম হয় “বিবির পুকুর”। বাংলাদেশের অন্য কোন বিভাগীয় শহরের প্রাণকেন্দ্রে এরকম জলাশয় নেই এবং এটি বরিশাল নগরীর অন্যতম সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য বলে বিবেচিত হয়।
দুর্গাসাগর দীঘি
ঐতিহাসিক এক প্রেমের নিদর্শন দুর্গাসাগর দীঘি। জনশ্রুতি এবং তথ্যনুসন্ধানে জানা যায়, ১৭৮০ সালে এই দীঘিটি খনন করার তৎকালীন চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যেও পঞ্চদশ রাজা শিব নারায়ন রায়। বাংলায় বারো ভূইয়ার একজন ছিলেন তিনি। স্ত্রী দুর্গাবতীর প্রতি ভালোবাসার গভীরতা প্রমাণের জন্যই নাকি তিনি রাজকোষ থেকে ৩ লাখ টাকা ব্যয়ে দীঘিটি খনন করান।
কথিত আছে, রানী দুর্গাবতী একবারে যতোদূর হাঁটতে পেরেছিলেন ততোখানি জায়গা নিয়ে এই দীঘি খনন করা হয়। রানী দূর্গাবতীর নামেই দীঘিটির নাম করন করা হয় দুর্গাসাগর দীঘি। দীঘিটি ৪৫ একর ৪২ শতাংশ জমিজুড়ে।
কালের বিবর্তনে দীর্ঘিটির ঔজ্জ্বল্য কিছুটা হারিয়েছে। তবে প্রতি শীত মৌসুমের শুরুতে সুদূর সাইবেরিয়া থেকে এখানে নানান প্রজাতির পাখি আসে। সরাইল ও বালিহাঁসসহ নানান প্রজাতির পাখি দীঘির মাঝখানে ঢিবিতে আশ্রয় নেয়। সাঁতার কাটে দীঘির স্বচ্ছ পানিতে।
জীবনানন্দ দাশের বাড়ি
বরিশাল শহরের বগুড়া রোডে এগিয়ে গেলে পথে পড়ে আম্বিয়া হাসপাতালের বিরাট ভবন। হাসপতালের পাশেই একটা বড় রিকশার গ্যারেজ। তার পাশেই গাছ-গাছালি ঘেরা ছায়া সুনিবিড় একটি বাড়ির দরোজা। প্রবেশ পথের মোট থামে হালকা লালচে মোটা থামে একটা নামফলক। ওই ফলকে কালো হরফে লেখা ‘ধানসিড়ি’।
হ্যাঁ, অনেক দিন আগে এ বাড়িতে থাকতেন নিভৃতের কবি জীবনানন্দ দাশ।
তার কবিতায় খুঁজে পাওয়া যায় এই বাংলাকে। যে নিভৃত স্থান থেকে তিনি লিখতেন জীবনের তত্ত্ব, সেই স্থান দেখাটাও সৌভাগ্যের। মনে হবে এই বুঝি জীবনানন্দ ঘুরছে আশপাশে, আর লিখছেন বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি তাই পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর’ কিংবা ‘মুখোমুখি বসিবার সেই নাটোরের বনলতা সেন।
বরিশালের এমন অপরূপ সৌন্দর্য দেখেই কবি লিখেছিলেন এমন অমর কবিতার বাণী।
তাই আর দেরি কেন জীবনানান্দের সেই বরিশাল দেখতে পা বাড়াতে পারেন এখনই।